Breaking News Ticker

সংক্ষেপে বাংলাদেশে শিল্পায়ন 

0
featured image

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ছিল ব্যবসাবাণিজ্য ও কারুশিল্পের জন্য খ্যাত। পাঁচ শতকে বাংলার সর্ববৃহৎ বন্দরনগরীর সঙ্গে দক্ষিণ ভারত, সিংহল, বার্মা, মালয়, পারস্য উপসাগর এবং দূরপ্রাচ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। এ সময়ে প্রধান প্রধান উন্নত শিল্পসমূহের মধ্যে ছিল বস্ত্রশিল্প, চিনিশিল্প, লবণশিল্প, গজদন্তশিল্প এবং ধাতুশিল্প। আট শতকে আরব দেশীয় বণিকগণ চট্টগ্রামের সঙ্গে বহির্বিশ্বের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

অনেক আগে থেকেই বাংলায় নৌকানির্মাণশিল্প উন্নতি লাভ করে। ঢাকার মসলিন বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। এমনকি পূর্বে বস্ত্র, চিনি, লবণ ও অলংকার রপ্তানিতে বাংলার রেকর্ড ছিল। ৬০০ সালের দিকে হস্তশিল্পও সমৃদ্ধি লাভ করে। অবশ্য উৎপাদনকারীদের কার্যক্রম কয়েক প্রকারের দ্রব্য উত্পাদনের মধ্যেই দীর্ঘদিন সীমাবদ্ধ ছিল এবং সতেরো শতক পর্যন্ত এর বিকাশ হয়েছে ধীর গতিতে। মোগল আমলে  বাংলায় উৎপাদন ক্ষেত্রে তেজিভাব আসে। রপ্তানি বাজারে বিদেশিদের অংশগ্রহণ শিল্প উন্নয়নে নতুন প্রেরণা জোগায়। 

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুদ্রার প্রসার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং মূলধন গঠন প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। ফলে নতুন নতুন বাজার ও উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপিত হয়। উৎপাদন ও বাজারের প্রসার ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বীমা খাতে বাণিজ্যিক কাগজপত্রের ব্যবহার জনপ্রিয় করে তোলে। বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে চিনি উৎপাদন জোরদার করা হয়। সতেরো শতকে নোনা পানি থেকে লবণ উৎপাদনে ব্যাপক উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়। এই সময়ের মধ্যে বাংলায় অন্যান্য যেসব দ্রব্য উত্পাদনের প্রসার ঘটেছিল তার মধ্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, ধাতুনির্মিত দ্রব্যাদি ও অস্ত্রপাতি, তামার ছাঁচ, গজদন্ত ভাস্কর্য, কাঠের কারুকাজ, সূচিশিল্প, অলংকার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বাংলায় বস্ত্রশিল্প ছিল সম্পূর্ণ কুটিরশিল্প নির্ভর। বস্ত্র উৎপাদন ও বস্ত্র ব্যবসার অর্থায়নে মহাজনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। 

রেশমগুটি চাষ ও রেশম উত্পাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদাবাদের অংশবিশেষ এখন রাজশাহীর অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য মধ্য ঊনিশ শতকে চীন ও জাপানে উৎপাদিত সস্তা রেশমের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে এবং ব্রিটেনে উৎপাদিত বিকল্প বস্ত্রের দ্রুত মূল্য হ্রাসের জন্য বাংলার রেশম শিল্পের প্রসার ব্যাহত হয়। 

ব্রিটিশ আমলে বাংলার শিল্পের, বিশেষ করে কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে, একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সীমিত শিল্প খাতে সংকীর্ণ বিশেষায়ন। বহু শতক ধরে ভারতে প্রচলিত বর্ণভিত্তিক কারুকর্মীদের বিশেষায়ন ব্রিটিশ আমলেও সমৃদ্ধি অর্জন করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এসব কুটির শিল্পের উন্নয়নে যথেষ্ট অবদান রাখেন। 

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান অবিভক্ত বাংলার শিল্পের সামান্যই উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করে। বাংলার ১০৮টি পাটকল, ১৮টি লৌহ ও ইস্পাত কল এবং ১৬টি কাগজ কলের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের অংশে একটিও পড়েনি। বাংলার ৩৮৯টি সুতাকলের মধ্যে মাত্র ৯০টি, ১৬৬টি চিনিকলের মধ্যে মাত্র ১০টি এবং ১৯টি সিমেন্ট কারখানার মধ্যে মাত্র ৩টি পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ডে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের সিলেটের ছাতকে অবস্থিত সিমেন্ট কারখানাকে চুনাপাথর সরবরাহের জন্য ভারতের আসামের ওপর নির্ভর করতে হতো। 

বাংলাদেশ আমল  ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৭২টি পাটকল, ৪৪টি বস্ত্রকল, ১৫টি চিনিকল, দুটি সারকারখানা, একটি ইস্পাতকল, একটি ডিজেল ইঞ্জিন ইউনিট এবং একটি জাহাজনির্মাণ কারখানা নিয়ে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প খাতের কার্যক্রম আরম্ভ হয়। রাষ্ট্রীয় নীতিতে বহু সমন্বয় ও সাময়িক পরিবর্তন আনয়ন করে সরকার অবশেষে ১৯৮২ সালে একটি নতুন শিল্পনীতি প্রণয়ন করে। 

বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায়ই তাঁতিদের বসতি আছে। কিন্তু নরসিংদী, বাবুরহাট, হোমনা, বাঞ্ছারামপুর, বাজিতপুর, টাঙ্গাইল, শাহাজাদপুর এবং যশোর এলাকায় তাদের অধিক সংখ্যায় কেন্দ্রীভূত রূপে দেখা যায়। রেশম শিল্প রাজশাহী ও ভোলাহাটে প্রসার লাভ করে। 

বস্ত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত খাতের অন্যতম শিল্প এবং অন্যান্য অধিকাংশ শিল্প খাতের মতোই বস্ত্র খাতকে লোকসানের বোঝা বহন করতে হয়েছে। এই খাতের অসুবিধাসমূহের মধ্যে রয়েছে দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষ শ্রমিক সৃষ্টির অসুবিধা, কাঁচামাল ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অপর্যাপ্ততা। 

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বালু, লবণ ও চুনাপাথর সহজলভ্য হওয়ায় দেশে কাচশিল্প উন্নয়নের বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। এই শিল্প স্থাপনের জন্য দুটি প্রধান স্থান হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম। দেশের সার শিল্পে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। দেশের প্রধান সিমেন্ট কারখানাদ্বয় ছাতক ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। পাবনার পাকশী এবং চট্টগ্রামের চন্দ্রঘোনায় রয়েছে বাংলাদেশের কাগজশিল্পের প্রধান কারখানা ম্যাচ উৎপাদনেও বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। দর্শনার চিনিকলে চিনি ছাড়া আরো উৎপন্ন হয় অ্যালকোহল, মেথিলেটেড স্পিরিট এবং রেক্টিফাইড স্পিরিট। 

বাংলাদেশের লৌহ ও ইস্পাত মিলগুলোর অধিকাংশই ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের অধীনে চট্টগ্রাম ও ঢাকাতে কেন্দ্রীভূত। অবশ্য খুলনা, কুষ্টিয়া ও বগুড়াতেও কিছু ইস্পাত ও লোহার কাজের প্রতিষ্ঠান আছে। ১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশে জাহাজনির্মাণ শিল্প, মোটরগাড়ি সন্নিবেশ শিল্প, তৈল, শোধনাগার, ইনসুলেটর ও চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির কারখানা, টেলিফোন যন্ত্রপাতি তৈরির শিল্প, বৈদ্যুতিক দ্রব্যাদি তৈরির কারখানা, টেলিভিশন সন্নিবেশ কারখানা, সিগারেট কোম্পানি এবং উদ্ভিজ্জ তেলকল বিশেষ স্থান অধিকার করে। এই সময় দেশে তৈরি পোশাকশিল্প ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করে।

লেখক : সহকারী কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার অ্যান্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)

buttons=(Accept !) days=(20)

Accept !
To Top